সত্তর-আশির দশকে যাঁর নাম ছাড়া বলিউডের পার্শ্বচরিত্রের তালিকা অসম্পূর্ণ, তিনি অরুণা ইরানি। ‘গঙ্গা যমুনা’ দিয়ে শিশুশিল্পী হিসেবে যাত্রা শুরু, পরে হিন্দি-সহ কন্নড়, গুজরাতি, মরাঠি মিলিয়ে ৫০০-রও বেশি ছবিতে অভিনয়। অথচ তাঁর প্রতিভা চোখ টেনেছিল রেখার মতো সুপারস্টারকেও—তবে ভাল অর্থে নয়। বরং ‘ঔরত ঔরত ঔরত’ ছবিতে তাঁর পারফরম্যান্স দেখে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করেন রেখা। রেখার কথায়, ‘‘তুমি দুর্দান্ত অভিনয় করলে, তাহলে আমার অভিনয় কেউ দেখত না। তাই তোমার দৃশ্যগুলো বাদ দিয়েছিলাম।’’

কৌতুক অভিনেতা মেহমুদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কেও মুখ খোলেন অরুণা। বলেন, ‘‘ঈশ্বর যেন দূত পাঠিয়েছিলেন আমার জীবনে।’’ যদিও মেহমুদ বিবাহিত ছিলেন, তাই সম্পর্ক টেকেনি। পরে বলিপাড়ায় কানাঘুষো, অরুণা নাকি মেহমুদকে বিয়েও করেছেন! এতেই তাঁর ক্যারিয়ারে ছায়া নেমে আসে। মেহমুদের স্ত্রী নির্দেশ দেন, অরুণার সঙ্গে যেন আর কাজ না করা হয়।

চোখে-মুখে যন্ত্রণা নিয়ে তিনি বলেন, ‘‘ছবিটি মুক্তি পেতে ছ’বছর লেগেছিল। কিন্তু মুক্তির পরে বুঝতে পারি, আমার অনেক দৃশ্যই নেই ছবিতে।

‘ববি’ ছবির একটি দৃশ্যে ঋষি কপূর গামছা পরে চুল মুছতে মুছতে এগিয়ে আসছেন, অরুণা তখনও ক্যামেরার সামনে। এই দৃশ্যে অভিনয় করতে আপত্তি জানান তিনি। রাজ কপূর নাছোড়, বুঝিয়ে বলেন, ‘‘ভাল জিনিসের দিকেই মন দাও।’’ শেষমেশ শুট করেন বটে, তবে শট কাট হওয়ার পর ঋষি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘‘তুমি কেন এত আপত্তি জানালে?’’ অরুণা বলেন, ‘‘লজ্জা পেয়েছিলাম।’’

১৯৭৩ সাল। রাজ কপূরের স্বপ্নের প্রজেক্ট ‘ববি’ মুক্তি পেয়েছে প্রেক্ষাগৃহে। ঋষি কপূর ও ডিম্পল কপাডিয়ার নতুন জুটি সাড়া ফেলেছে সারা দেশে। কিন্তু এই ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যে অভিনয়ের কথা ছিল আর এক অভিজ্ঞ অভিনেত্রী অরুণা ইরানির। অথচ চিত্রনাট্য পড়েই পিছু হঠলেন তিনি।

‘ছবিটা শেষ হলেও মুক্তি পেতে লেগে গিয়েছিল ছ’বছর। আর মুক্তির পরে অরুণা ইরানির ধাক্কা খাওয়ার পালা। বুঝলেন, তাঁর অধিকাংশ দৃশ্যই নাকি ছবি থেকে উধাও! শুধু তাই নয়, রেখা নাকি এক ছবির কাস্টিং তালিকা থেকেও বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন তাঁকে।

স্মৃতিচারণায় অরুণা বলেন, ‘‘অনেকেই এমন চরিত্রে অভিনয়ের জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করে। আমিও চেয়েছিলাম নিজের সেরাটা দিতে। শুটিংয়ের সময় রেখা বার বার বলত, আমার চরিত্রটা নাকি ওর থেকে অনেক ভাল। এরপরই দেখি, আমার অভিনীত গুরুত্বপূর্ণ সব দৃশ্য একে একে বাদ পড়ছে।

‘মঙ্গলসূত্র’ নামের একটি ছবিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে কাজের প্রস্তাব পেয়েছিলেন অরুণা। অগ্রিম টাকাও হাতে এসেছিল। পরে শুনতে হয়, চরিত্রটিই বাদ! পরে জানা যায়, এই সিদ্ধান্তও নাকি রেখার অনুরোধেই। অরুণা বলেছিলেন, রেখা একসময় তাঁর বন্ধু হলেও, ক্যারিয়ারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বহুবার।

‘ঔরত ঔরত ঔরত’ ছবিতে এক শক্তিশালী চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন অরুণা ইরানি। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন নিজের কেরিয়ারের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স দেওয়ার। কিন্তু সেই স্বপ্নে হঠাৎই ছেদ পড়ে। কারণ, একই ছবিতে ছিলেন রেখা।

জীবনের সব চেয়ে বড় লড়াই অবশ্য ছিল ক্যানসার। পর পর দু’বার স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন অরুণা। প্রথমবার কেমোথেরাপি না নিয়েই সেরে উঠেছিলেন। দ্বিতীয়বার ২০২০ সালে ফের আক্রান্ত হন। তখন কেমো নিতে হয়। বলেন, ‘‘চুল পড়ে গেলে অভিনয় করব কী করে—এই চিন্তায় ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।’’

আজ তিনি ৭৮ পেরিয়ে ৭৯-র পথে। ছোট পর্দায় শেষ দেখা ২০১৯ সালে হলেও বড়পর্দায় এখনো কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। মে মাসেই মুক্তি পেয়েছে তাঁর অভিনীত ‘কেসরী বীর’।

‘১৯৬১ সালে মাত্র শিশু বয়সে বড় পর্দায় আত্মপ্রকাশ—দিলীপ কুমার-বৈজয়ন্তীমালা অভিনীত ‘গঙ্গা যমুনা’ ছবিতে। সেখান থেকেই শুরু অরুণা ইরানির দীর্ঘ, বিচিত্র অভিনয়যাত্রা। হিন্দির পাশাপাশি কন্নড়, গুজরাতি, মরাঠি—মোট পাঁচশোরও বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি।

অভিনয়ের সুযোগ থাকলেও, নিজের মূল্যবোধকে বেছে নিয়েছিলেন অরুণা। এমন সিদ্ধান্ত খুব কম শিল্পীর পক্ষেই সম্ভব হয়। রাজ কপূরের মতো পরিচালককেও ‘না’ বলার সাহস দেখিয়েছিলেন তিনি।
